মাতারবাড়ি-১: জাপানের ৬ বিলিয়ন ডলারের কয়লা-বিপর্যয়
মাতারবাড়ি-১ কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র: জাপানের ভূমিকা, মানুষের দুর্ভোগ, দুর্নীতির অভিযোগ এবং নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ শক্তির বাস্তবতা
জাপানের অর্থায়নে ৬ বিলিয়ন ডলারের মাতারবাড়ি-১ একটি ধ্বংসাত্মক কয়লা প্রকল্প, যা মানুষের বাস্তুচ্যুতি, নদী ধ্বংস, দূষণ আর ঋণের বোঝার সমার্থক হয়ে দাঁড়িয়েছে। জাপানের উচিত কয়লার বদলে নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎতে অর্থায়ন করা।
নতুন করে আর কোনো কয়লা বা এলএনজি প্রকল্প চান না?
মাতারবাড়ি ১: কয়লা আমদানির ওপর নির্ভরতা
- মাতারবাড়ি-১ হলো চট্টগ্রামের ১,২০০ মেগাওয়াটের একটি কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প, যার অর্থের জোগানদাতা জাইকা।
- সুমিতোমো কর্পোরেশন, তোশিবা এবং আইএইচআই (IHI) এর মতো জাপানি কোম্পানিগুলো এর নির্মাণ কার্যক্রমে যুক্ত ছিল।
- উন্নয়ন’ এর নামে প্রচার করা হলেও এই প্রকল্পের কারণে বহু পরিবার বাস্তুচ্যুত হয়েছে, মানুষের জীবিকা ধ্বংস হয়েছে, নদী দূষিত হয়েছে এবং বাংলাদেশকে বছরের পর বছর আমদানিকৃত কয়লা ও কোটি কোটি টন কার্বন নির্গমনের ফাঁদে আটকে ফেলা হয়েছে।
- জাপান যেহেতু এই সমস্যার জন্ম দিয়েছে, এর সমাধানের দায়িত্বও তাদেরই নিতে হবে।
মাতারবাড়ি-১ এর জন্য যে মূল্য চোকাতে হয়েছে
৬ বিলিয়ন ডলার
বিদ্যুৎকেন্দ্র ও অবকাঠামোর মোট খরচ। এটি বিশ্বের অন্যতম ব্যয়বহুল কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প।
১,২০০ মেগাওয়াট
কয়লাভিত্তিক দুটি ইউনিটের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা, যা চালুর পর থেকে কোটি কোটি টন কার্বন নির্গমন ঘটাবে।
২,০০০+ জেলে
কোহেলিয়া নদী ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় দুই হাজারের বেশি জেলে জীবিকা হারিয়েছেন। এর পাশাপাশি লবণ চাষী, চিংড়ি চাষী ও কৃষকরাও ক্ষতির মুখে পড়েছেন, যার কোনো ক্ষতিপূরণ তারা পাননি।
বছরের পর বছর কয়লা আমদানি
এর ফলে বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা ও বৈদেশিক মুদ্রার চাপের মুখে পড়তে হচ্ছে।
খেসারত দিচ্ছে স্থানীয় জনগণ
মাতারবাড়ি ও ধলঘাটার পরিবারগুলো মাছ ধরা, লবণ চাষ ও কৃষিকাজের ওপর নির্ভরশীল ছিল।
মাতারবাড়ি-১ কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের জন্য তাদের জমি কেড়ে নেওয়া হয়েছে, বাড়িঘর ও কৃষিজমি থেকে উচ্ছেদ করা হয়েছে, সেইসাথে কোহেলিয়া নদীর ক্ষতি করা হয়েছে।
ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর মতে, তাদের ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা ছিল খুবই অপ্রতুল। চাকরি ও ক্ষতিপূরণের যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তা পূরণ করা হয়নি বলে বাসিন্দাদের অভিযোগ।
২০২৬ সালের জুনে স্থানীয় বাসিন্দারা মাতারবাড়ী কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কারণে সৃষ্ট পরিবেশগত ও জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। অভিযোগ রয়েছে, কেন্দ্রটি থেকে দুর্গন্ধযুক্ত কালো ধোঁয়া নির্গত হচ্ছিল। তাঁরা এই দূষণের সুষ্ঠু তদন্ত, জবাবদিহি এবং কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানান।
বাংলাদেশ এমনিতেই তীব্র বায়ুদূষণের সংকটে রয়েছে। মাতারবাড়ী-১ প্রকল্প এই পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলছে।
সুশাসন নিয়ে প্রশ্ন তুলছে দুর্নীতির অভিযোগ
বাংলাদেশে মাতারবাড়ী-১ কয়লাভিত্তিক প্রকল্পের সঙ্গে দুর্নীতির তদন্তের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। ২০২৫ সালে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এই প্রকল্পের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জন ও লাখ লাখ ডলারের সন্দেহজনক লেনদেনের অভিযোগের তদন্ত করে। এর পরিপ্রেক্ষিতে জাইকা সতর্ক করে দেয়, বাংলাদেশ সরকারের কাছ থেকে সন্তোষজনক ব্যাখ্যা না পাওয়া পর্যন্ত তারা এই প্রকল্পের অর্থায়ন স্থগিত করতে পারে।
এর আগের প্রতিবেদনগুলোতেও মাতারবাড়ী-১ প্রকল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতি ক্রয়প্রক্রিয়ায় অনিয়ম ও অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়ের বিষয়টি উঠে এসেছে।
দুর্নীতির এসব অভিযোগ জীবাশ্ম জ্বালানির বড় বড় অবকাঠামো প্রকল্পে সুশাসনের ঝুঁকি এবং আরও বেশি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির প্রয়োজনীয়তাকে সামনে নিয়ে এসেছে।
মাতারবাড়ি-২ থামানো গেছে। এবার জীবাশ্ম জ্বালানির আগ্রাসনও থামাতে হবে।
মাতারবাড়ি ১ এ যে শত শত কোটি ডলার খরচ করা হয়েছে, নতুন কোনো জীবাশ্ম গ্যাস বা এলএনজি প্রকল্পের মাধ্যমে তার পুনরাবৃত্তি কাম্য নয়।
জাপান তার ইতিহাসে সর্বোচ্চ বৈদেশিক উন্নয়ন সহায়তা দিয়ে মাতারবাড়ি ১ প্রকল্পে অর্থায়নের পর, জনরোষ ও জলবায়ু উদ্বেগের মুখে ২০২২ সালে প্রস্তাবিত মাতারবাড়ি ২ কয়লা প্রকল্প থেকে সরে দাঁড়ায়।
কিন্তু জাপান সমর্থিত মিডি মেগাপ্রকল্পের আওতায় বৃহত্তর মাতারবাড়ি-মহেশখালী অঞ্চলে এলএনজি টার্মিনাল ও গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা এখনও চলছে। এতে এক জীবাশ্ম জ্বালানির জায়গায় অন্য জীবাশ্ম জ্বালানি প্রতিস্থাপনের ঝুঁকি দেখা দিচ্ছে।
বাংলাদেশের এখন প্রয়োজন আরও সাশ্রয়ী ও নির্ভরযোগ্য নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ, ব্যাটারি স্টোরেজ এবং আধুনিক গ্রিড প্রযুক্তি; যেখানে সহায়তা করার সক্ষমতা জাপানের রয়েছে।
জাইকা এবং জাপানি কোম্পানিগুলোকে নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎতে বিনিয়োগের আহ্বান জানান!
সোর্স
- Market Forces, Expensive LNG Expansion: How foreign gas interests are a climate disaster for Bangladesh, 2024. https://fossilfreechattogram.com/Bangladesh-LNG-Report-2024-English-Full-Report
- KTV24, Press Conference on Toxic, Foul-Smelling Black Smoke Emission at Matarbari Coal Power Plant, 2026. https://www.youtube.com/watch?v=VBLOHKS65nk
- The Financial Today, JICA may halt Matarbari power project funding over corruption allegations, 2025. https://www.thefinancetoday.net/national/fef639834589
- Finance Today, CPGCBL now in controversy over dry ash tender, 2024. https://www.thefinancetoday.net/national/5804e0268b87
- JACSES, Friends of the Earth Japan & Mekong Watch, JICA must stop the loan disbursement now and ascertain the corruption in Bangladesh's coal project, 2025. https://jacses.org/en/592/
- JACSES, Local company official and others arrested for corruption in ODA coal-fired power project in Bangladesh, 2024. https://jacses.org/en/446/
- The Daily Star, "If not corruption, what?," 2024. https://www.thedailystar.net/opinion/editorial/news/if-not-corruption-what-3580411
আসুন চট্টগ্রামকে জীবাশ্ম জ্বালানিমুক্ত করি!
জাইকা, জেরা, সুমিতোমো ও সংশ্লিষ্ট অন্য কোম্পানিগুলোকে একটি বার্তা পাঠিয়ে চট্টগ্রামকে বাঁচান। প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজিতে নয়, কোম্পানিগুলো চাইলে নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎতে অর্থায়ন করতে পারে। এতে বদলে যেতে পারে এদেশের বিদ্যুৎ খাত, পাশাপাশি রক্ষা পাবে স্থানীয় মানুষ, জীববৈচিত্র্য ও দেশের অর্থনীতি।
ব্যয়বহুল এলএনজি’র বিস্তার: বিদেশিদের এলএনজি-সংক্রান্ত স্বার্থ যেভাবে বাংলাদেশের জন্য জলবায়ু ঝুঁকি তৈরি করছে
November 2024
বর্তমানে বাংলাদেশ বেশ বড় ধরনের একটি জ্বালানী সংকটের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। উচ্চমূল্যে আমদানিকৃত জীবাশ্ম গ্যাস থেকে তৈরি বিদ্যুতের ওপর অতিনির্ভরশীলতার ফলেই দেশে বেড়েছে লোডশেডিংও।
এমতাবস্থায়, বাংলাদেশের উচিৎ ছিলো অস্থিতিশীল আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেরি উপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে পরিচ্ছন্ন ও নবায়নযোগ্য দেশীয় জ্বালানিকে গুরুত্ব দেয়া। অথচ, তা না করে বিদেশী স্বার্থান্বেষী মহলের প্রভাবে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করার দিকে এগোচ্ছে বাংলাদেশ।
বাংলাদেশ পরিবেশ বান্ধব, সবুজ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে অগ্রসর হতে পারে, যা পরিবেশের সুরক্ষা নিশ্চিত করার পাশাপাশি জনগণের জন্য কমমূল্যে সাশ্রয়ী বিদ্যুতের ব্যবস্থা করতে পারে।
